বেতনের দিনের খরচ: মাসের শুরুতে রাজা, শেষে ফকির কেন
বেতন ঢোকার প্রথম সপ্তাহে খরচ বেশি, শেষ সপ্তাহে টানাটানি — এই চক্র খুব চেনা। গবেষণা বলছে এটা শুধু আমাদের নয়, আর এর কয়েকটা সহজ সমাধানও আছে।
মাসের এক তারিখ। ফোনে বেতন ঢোকার মেসেজ এল। সেদিন রাতে বাইরে খাওয়া হলো, পরদিন একটা শার্ট, সপ্তাহের শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। বিশ তারিখ আসতে আসতে হিসাব টানাটানি, পঁচিশে গিয়ে রিকশার বদলে হাঁটা, আর মাসের শেষ তিন দিন ডিম-ভাত। তারপর আবার এক তারিখ, আবার একই চক্র।
যদি এটা চেনা লাগে, আপনি একা নন। অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন দেশে এই ধরনটা মেপেছেন, আর দেখেছেন আয় হাতে আসার ঠিক পরে খরচ লাফিয়ে বাড়ে, তারপর ধীরে ধীরে কমে আসে। এই লেখায় দেখব কেন এমন হয়, আর মাসটাকে একটু সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার কয়েকটা সহজ উপায়।
গবেষণায় বেতনের দিনের লাফ
তাত্ত্বিকভাবে, অর্থনীতির পুরোনো মডেল বলে মানুষ সারা মাস জুড়ে মোটামুটি সমানভাবে খরচ করবে — কারণ টাকা কবে আসছে তা আগে থেকেই জানা। বাস্তবে তা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে মেলভিন স্টিফেনস অবসরভাতা পাওয়া মানুষদের খরচ নিয়ে গবেষণায় দেখেন, ভাতা হাতে আসার ঠিক পরের দিনগুলোতে খাবার আর অন্যান্য তাৎক্ষণিক খরচ লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায় (American Economic Review, ২০০৩)। জেসি শাপিরো খাদ্য সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর ক্যালরি গ্রহণ নিয়ে গবেষণা করে দেখেন, সহায়তা আসার পর থেকে মাস যত এগোয়, খাবার গ্রহণ তত কমে আসে (Journal of Public Economics, ২০০৫)।
এই গবেষণাগুলো অন্য দেশের, অন্য ধরনের আয় নিয়ে। বাংলাদেশের বেতনভোগীদের ওপর একই মাপের গবেষণার কথা আমাদের জানা নেই। তবে যে প্রবণতাটা দেখা যায় — হাতে টাকা থাকলে খরচ বাড়ে, আর “পরে” নিয়ে কম ভাবি — তা আমাদের অনেকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে।
কেন এমন হয়
হাতের টাকা আর ভবিষ্যতের টাকা আলাদা লাগে। রিচার্ড থেলার ও হার্শ শেফরিন আত্মনিয়ন্ত্রণকে বর্ণনা করেছিলেন আমাদের ভেতরের দুই সত্তার টানাপোড়েন হিসেবে: একজন “পরিকল্পনাকারী”, যে দূরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে, আর একজন “কর্তা”, যে এই মুহূর্তটা নিয়েই ব্যস্ত (Journal of Political Economy, ১৯৮১)। বেতন ঢোকার দিন কর্তার হাতে অনেক টাকা, আর পরিকল্পনাকারী তখন পেছনের সারিতে।
মাসের শুরুতে ব্যালান্স বড় দেখায়। অ্যাকাউন্টে বড় একটা অঙ্ক দেখলে ছোট খরচগুলো তুচ্ছ মনে হয়। ৳৫০,০০০ থেকে ৳৮০০ বাইরে খাওয়ায় গেলে তেমন কিছু মনে হয় না। কিন্তু বিশ তারিখে সেই ৳৮০০ অনেক বড় লাগে।
“নিজেকে একটু পুরস্কার দিই।” সারা মাস খাটার পর বেতনের দিনটা উদ্যাপনের মতো। এতে কোনো দোষ নেই — কিন্তু উদ্যাপনটা যদি এক সন্ধ্যা থেকে এক সপ্তাহে ছড়িয়ে যায়, তখনই সমস্যা।
ভবিষ্যতের “আমি” অচেনা। হ্যাল হার্শফিল্ড ও সহকর্মীদের গবেষণা দেখায়, আমরা নিজের ভবিষ্যৎ সত্তাকে অনেকটা অন্য মানুষের মতো ভাবি (Journal of Marketing Research, ২০১১)। মাসের পঁচিশ তারিখের মানুষটি যেন অন্য কেউ, তার সমস্যা তার।
মাসটাকে সমান করার সহজ উপায়
বেতনের দিনেই আগে সরিয়ে রাখুন। বেতন ঢোকার দিনই বাসাভাড়া, বিল, কিস্তি আর সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করে ফেলুন — সম্ভব হলে আলাদা অ্যাকাউন্টে বা খামে। যা বাকি থাকে, সেটাই আসলে “খরচ করার টাকা”। একে অনেকে বলেন “আগে নিজেকে দিন”। এতে কর্তার হাতে কম টাকা যায়, আর পরিকল্পনাকারীর কাজটা আগেই হয়ে যায়।
খরচের টাকাকে সপ্তাহে ভাগ করুন। খরচ করার টাকাকে চার বা পাঁচ ভাগ করুন, প্রতি সপ্তাহে একটা ভাগ। প্রথম সপ্তাহের ভাগ শেষ হলে দ্বিতীয় সপ্তাহের ভাগ ধরবেন না। এক মাসের একটা বড় সংখ্যার চেয়ে এক সপ্তাহের ছোট সংখ্যা সামলানো অনেক সহজ।
উদ্যাপনের একটা বাজেট রাখুন। বেতনের দিনের আনন্দটা বাদ দেওয়ার দরকার নেই। শুধু আগে ঠিক করুন সেটা কত — ধরুন একটা ভালো রাতের খাবার — আর সেটুকুই। আমাদের ডোপামিন খাবারের দোকানে চাইলে উদ্যাপনের “দ্বিতীয় রাউন্ড”টা ৳০.০০-তে সেরে নিতে পারেন।
প্রথম সপ্তাহে বড় কেনাকাটা নয়। বেতনের প্রথম সপ্তাহে বড় কোনো কেনাকাটার ইচ্ছা হলে সেটা মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পিছিয়ে দিন। তখনো যদি চান আর টাকা থাকে, কিনুন। অনেক সময় দেখবেন ইচ্ছাটা বেতনের দিনের উচ্ছ্বাস ছিল।
কিস্তির তারিখ বেতনের কাছে রাখুন। যদি কোনো কিস্তি বা বিল থাকে, সম্ভব হলে সেগুলোর তারিখ বেতনের দিনের কাছাকাছি রাখুন, যাতে টাকাটা খরচ হওয়ার আগেই চলে যায়। কিস্তি নিয়ে আরও জানতে দেখুন ০% সুদের কিস্তির আসল খরচ।
মাস শেষে একবার পেছনে তাকান। কোন সপ্তাহে কত খরচ হলো, তা দেখুন। প্রথম সপ্তাহ যদি বাকি তিন সপ্তাহের সমান হয়, সেটাই আপনার চক্রের মাপ। এর সহজ উপায় পাবেন খরচের হিসাব রাখার সহজ পদ্ধতি লেখায়।
বোনাস আর উৎসব ভাতা
বেতনের বাইরে হঠাৎ আসা টাকা — উৎসব ভাতা, বোনাস, উপহার — মনের ভেতর আরও আলাদা একটা বাক্সে যায়। থেলারের মেন্টাল অ্যাকাউন্টিংয়ের ধারণা অনুযায়ী, আমরা এমন “বাড়তি” টাকাকে প্রায়ই নিয়মিত আয়ের চেয়ে সহজে খরচ করি, যেন এটা আসল টাকা নয়। অথচ টাকা টাকাই। বোনাস হাতে পেলে একটা সহজ নিয়ম কাজে আসতে পারে: একটা অংশ আনন্দের জন্য, একটা অংশ সঞ্চয় বা ঋণ শোধের জন্য, আর একটা অংশ পরের বড় খরচের জন্য। ঈদের ভাতা কীভাবে ভাগ করবেন, তা নিয়ে লিখেছি ঈদ শপিং বাজেট লেখায়।
পরিবারের সঙ্গে মাসের শুরুর বৈঠক
যদি পরিবারের কয়েকজন মিলে সংসার চালান, তাহলে বেতনের দিনের পরে দশ মিনিটের একটা ছোট বৈঠক অনেক কাজে আসে। সবাই মিলে ঠিক করুন এই মাসে কোন বড় খরচগুলো আসছে — স্কুলের ফি, কারও জন্মদিন, আত্মীয়ের বিয়ে, ঘর মেরামত। তারপর দেখুন সেগুলোর জন্য কত সরিয়ে রাখতে হবে, আর বাকিটা কীভাবে ভাগ হবে। বৈঠকটা আনুষ্ঠানিক হওয়ার দরকার নেই; চায়ের কাপ হাতে কথা বললেই চলে।
এতে দুটো লাভ হয়। প্রথমত, মাসের মাঝখানে হঠাৎ কোনো বড় খরচ এসে সবাইকে চমকে দেয় না। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকে জানে তার ভাগে কত আছে, তাই বেতনের দিনের উচ্ছ্বাসে কেউ অন্যের ভাগে হাত দেয় না।
যখন সমস্যাটা আয়ের
সব টানাটানি খরচের অভ্যাস থেকে আসে না। অনেকের আয়ই জরুরি খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, আর সেখানে কোনো বাজেটের কৌশল জাদু করতে পারে না। যদি বারবার মাস শেষ হওয়ার আগেই জরুরি খরচের টাকা ফুরিয়ে যায়, আর ধার করে চলতে হয়, তাহলে একজন বিশ্বস্ত আর্থিক পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলা ভালো। এই লেখা সেই পরিস্থিতির সমাধান দিতে পারে না।
প্রশ্নোত্তর
বেতনের দিনে একটু বেশি খরচ করা কি ভুল?
না। পরিকল্পিত একটা উদ্যাপন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। সমস্যা হয় যখন উদ্যাপনের খরচ মাসের বাকি দিনগুলোর প্রয়োজনের টাকায় হাত দেয়।
আলাদা অ্যাকাউন্ট না থাকলে কীভাবে টাকা সরিয়ে রাখব?
খাম, বয়াম বা একটা নোটে লেখা সংখ্যা দিয়েও কাজ চলে। মূল কথা হলো টাকাটা মনের ভেতর আলাদা বাক্সে রাখা, আর সেই বাক্সে হাত না দেওয়া।
সাপ্তাহিক ভাগ কি সবার জন্য কাজ করে?
সবার জন্য নয়। যাঁদের আয় অনিয়মিত, তাঁদের জন্য অন্য পদ্ধতি লাগতে পারে। তবু অনেকের কাছে ছোট সময়ের ছোট সংখ্যা সামলানো সহজ মনে হয়।
এই সাইট কি আমার আসল খরচ দেখে?
না। এখানে কোনো আসল টাকা, কার্ড বা ব্যাংকের তথ্য নেওয়া হয় না। সব অর্ডার ডোপামিন আর দাম ৳০.০০।
উৎস
- Stephens, M., Jr. (2003). “3rd of tha month”: Do Social Security recipients smooth consumption between checks? American Economic Review, 93(1), 406–422.
- Shapiro, J. M. (2005). Is there a daily discount rate? Evidence from the food stamp nutrition cycle. Journal of Public Economics, 89(2–3), 303–325.
- Thaler, R. H., & Shefrin, H. M. (1981). An economic theory of self-control. Journal of Political Economy, 89(2), 392–406.
- Hershfield, H. E., et al. (2011). Increasing saving behavior through age-progressed renderings of the future self. Journal of Marketing Research, 48(SPL), S23–S37.
- Thaler, R. H. (1999). Mental accounting matters. Journal of Behavioral Decision Making, 12(3), 183–206.
এই লেখা সাধারণ তথ্য ও বিনোদনের জন্য; চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক বা আর্থিক পরামর্শ নয়।
আসক্তি মনে হচ্ছে? এখান থেকে সাহায্য নিন
আপনার কেনাকাটা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে মনে হয়, সাহায্য নিতে পারেন:
- কান পেতে রই (মানসিক সহায়তা হেল্পলাইন) — <VERIFY NUMBER BEFORE LAUNCH>
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), ঢাকা — <VERIFY>
- আপনার এলাকার একজন রেজিস্টার্ড মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলর
এই সাইট বিনোদনের জন্য; এটি চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়।